চাঁদের গায়ে চাঁদ - তিলোত্তমা মজুমদার Chander Gaye Chand by Tilottama Majumder

চাঁদের গায়ে চাঁদ - তিলোত্তমা মজুমদার Chander Gaye Chand by Tilottama Majumder

চাঁদের গায়ে চাঁদ
তিলোত্তমা মজুমদার

এই যে রোজ সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়, এই পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, মানুষ জন্মায় মানুষের মৃত্যু হয়, এই জন্ম - মৃত্যুর মাঝে যে সময়টুকু থাকে তার মধ্যে তার পড়াশোনা, চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা সব একটা চক্রে আবর্তিত হয় যেটাকে আমরা বলি জীবন- চক্র বা সার্কেল অফ লাইফ। আচ্ছা হঠাৎ যদি এই জীবন চক্র চেনা ছন্দে না হয়ে একটু অচেনা সুরে বাজে তাহলে? তাহলে কি চক্র থেমে যাবে? সূর্য উঠবে না না কি প্রকৃতি পাল্টে যাবে? কিচ্ছুটি হবে না যশাই সব যেমন চলছে তেমন ই চলবে। যে কাজ প্রকৃতি বিরুদ্ধ সেই কাজ প্রকৃতি নিজেই বন্ধ করে দেবে আপনাকে মাথা খাটাতে হবে ই না। তাই যেটা প্রকৃতি মেনে নিয়েছে সেখানে বিরোধ কিসের? এবার আসি বই প্রসঙ্গে।
বই টির কেন্দ্রবিন্দু তে আছে তিনটে মেয়ে ও তাদের ঘিরে অন্যান্যরা। শ্রেয়া, দেবরূপা, শ্রুতি। এরা আমার আপনার মত সাধারণ ঘরের মেয়ে। শ্রুতির ভাই এ আর্টিস্টিক, দেবরূপা রা তিন ভাই বোন। শ্রেয়ার বাড়ির কোনো ডিটেইলস নেই। এদের তিনজনের দেখা হয় সরকারি হোস্টেলে। এরা রুমমেট। এদের মধ্যে দেবরূপা একটু টম বয় গোছের। চেহারাতেও স্বভাবেও। শ্রুতি একটু চুপচাপ, একটু মুখচোরা কিন্তু খুব ই শক্ত মানসিকতার। শ্রেয়া সুন্দরী। কি ভাবছেন? দেখেন নি এরকম মেয়েদের? দেখেছেন, রোজ দেখেন। তিনজনের কলেজ আলাদা বিষয় আলাদা তাই এদের পড়াশোনা কেন্দ্র করে কোনো বন্ধুত্বের গল্প নেই। গল্পটা অন্য জায়গায়। এরা যে বয়সের সেই বয়সে তুমুল প্রেম স্বাভাবিক, প্রেমে সবকিছু ভাসিয়ে দেওয়া দেশপ্রেমে উত্তাল হওয়া, রুপোলি পর্দার নায়ক কে দেখে স্বপ্নে তাকে কল্পনা করা স্বাভাবিক। এবং সম্ভবত এই বয়সেই নিজের পছন্দ ও গড়ে ওঠা স্বাভাবিক। এই তিনজন ও স্বাভাবিক। শ্রেয়ার প্রেমিক আছে শ্রুতির শ্রেয়া কে ভালোবাসা একজন বনধু হিসেবে এবং দেবরূপা ও শ্রেয়ার একটু অন্যরকম বনযুদ্ধ। ভুরু কুঁচকে গেল? উঁচু তখনও এরা স্বাভাবিক। শ্রেয়া দেবরূপার কাছাকাছি আসা এবং ফলস্বরূপ শ্রুতির সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। এই দূরত্ব শ্রুতি কে প্রতি মুহূর্তে আহত করে। শ্রুতি ওমড়ায়, কিন্তু বন্ধুত্ব ছাড়ে না। আরেকজন রুমমেট যখন রুম বদল করে এই অন্যরকম বনধুত্বের জন্য তখনও শ্রুতি ওদের স্বাভাবিক ভাবে। শ্রুতির এই স্বাভাবিক ভাবার দাম চোকাতে হয় বহু মূল্য দিয়ে। হোস্টেলে জানাজানি হওয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ে তারা কিন্তু শ্রুতি তখনও ওদের স্বাভাবিক ভাবে। ফলে তিনজনকেই হোস্টেল ছাড়তে হয় পড়া অসম্পূর্ণ রেখে। একদা বাড়ির হাল ধরবে বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ শ্রুতি ফিরে আসে খালি হাতে। বৃদ্ধ বাবা তখন পাগলপ্রায়। আর ভাই সে তখন বেশ যুবক। তারও কামোদ্দীপনা জেগে ওঠে শ্রুতি কে দেখে। বাড়ির কাজের মাসি এই ঘটনায় সীলমোহর দেয়। শ্রুতি তখন থেকে বন্ধ দরজার ওপারে শোয়। ইতিমধ্যে শ্রুতি একটা এন.জি.ও এর সাথে যুক্ত হয়। এরা মূলত স্টেশনে থাকা শিশুদের নিয়ে কাজ করে। শুধু পড়ানো নয় তাদের সুবিধা, অসুবিধা সব কিছু নিয়েই চলতে হয় তাদের। এই সব শিশু ই ভীষণ ভাবে যৌন লাঞ্ছনা এবং অত্যাচার এর শিকার হয়। একটা তিন বছরের বাচ্চা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে মারা যায়। শ্রুতির বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে। ইতিমধ্যে এখানে এসে উপস্থিত হয় দেবরূপা। কেউ কারোর কাছে কোনো জবাব দিহি করে না। শ্রুতি এখন জানে দেবরূপা মেয়েদের পছন্দ করে, ছেলেদের নয়। দেবরূপার ভাই শ্রুতি কে জানিয়েছিল যে দেবরূপা তার অবদমিত ইচ্ছার জন্য তার ভাইকে মেয়েলি করে তুলতে চেয়েছিল। সেই কলেজের ঘটনার পর দেবরূপার বাড়িতে অশান্তি হওয়ায় এবং দেবরূপা বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ায় ভাই এর ওপর আর সেই চাপ থাকে না। সমসাময়িক বন্ধু ও প্রেমিকার চাপে তার সেই মেয়েলি ব্যাপারের খোলস খসে পড়ে। এরপর সেই এন.জি.ও তে মেয়েলি ব্যাপারের খোলস খসে পড়ে। এরপর সেই এন.জি.ও তে একদিন শ্রুতি দেবরূপা আর একটি মেয়েকে অতি ঘনিষ্ট অবস্থায় দেখে এবং খুব খুশি হয়। হয়তো বা নিজের যৌন চাহিদা চিনতে পারে। বই টা আমার ভালো লেগেছে কারণ লেখার বিষয়বস্তু। একটা স্পর্শকাতর বিষয়কে এত সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা।
খুব সহজ ভাষায় লেখা লেখার চমৎকার বিশ্লেষণ। লেখনীর গুনে শ্রুতিরা খুব কাছের হয়ে যায়।
এত অপূর্ব লেখা সত্যি মনকে ভাবায় মনে হয় কেন লোকে এতে এত অস্বাভাবিক দেখে। খুব স্বাভাবিক ঘটনা এগুলো। সমাজ বদলাচ্ছে, সমাজ বদলাবে। জোর করে স্বাভাবিক জিনিসকে অস্বাভাবিক তকমা লাগিয়ে দেবেন না।

বি.দ্র. বই এর কস্টেস্ট জেনেই বই টা নেবেন পড়ার জন্য বা কেনার জন্য। না হলে সময় আর টাকা দুটোই নষ্ট করবেন।

রিভিউটি লিখেছেনঃ payel Mukherjee

Post a Comment

0 Comments