সাত পুতুল - সৌরভ মুখোপাধ্যায় Sat Putul by Sourav Mukhopadhyay

সাত পুতুল - সৌরভ মুখোপাধ্যায় Sat Putul by Sourav Mukhopadhyay

সাত পুতুল 
সৌরভ মুখোপাধ্যায় 

ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার নীল চ্যাটার্জির বিচিত্র অভিজ্ঞতাভিত্তিক নানা গল্প কাহিনীগুলির মধ্যে আরেকটি নবতর সংযোজন এই বড় গল্পটি।  হাতিবাড়ি অঞ্চলের প্রাচীন জনজাতি অধ্যুষিত গ্রাম কুসুমকুঁয়া থেকে তার নিজস্ব জড়িবুটির চিকিৎসা উপকরণ নিয়ে পথে পথে ফেরি করে কালোমানিক দাস। শহুরে আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায়  শিক্ষিত মানুষজন সেগুলিকে নিতান্ত ধাপ্পাবাজি বলে ভাবে, প্রবল তাচ্ছিল্যের সঙ্গে পাশ কাটিয়ে যায়। অথচ আদি অনন্তকাল থেকে ভারতবর্ষের কোটি কোটি গরীব নিরুপায় অসহায় মানুষদের সুস্থতার জন্য একমাত্র অবলম্বন ভরসা সান্ত্বনা এই জড়িবুটি। সব কিছু যে  ফাঁকিবাজি নয়, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষগুলি পুরুষানুক্রমে প্রকৃতির কাছে থেকে ভালো থাকার নিদান সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে, বেঁচে আছে, এ সত্য তো অস্বীকারের নয়। আর আদিম বনজ সম্পদ প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা বহু রহস্যময় উপকরণ যে মানুষের ত্রাতা হতে পারে, মানুষের প্রাণরক্ষার সহায়ক হতে পারে। আজকের চিকিৎসা বিদ্যাও তাকে অস্বীকার করে না।

কলকাতার ফুটপাতে এই জড়িবুটি নিয়ে বসা কালোমানিক দাসের সঙ্গে নীল চ্যাটার্জির নেহাতই আকস্মিকভাবে আলাপ হয়েছিল। সাদামাঠা অতি পরিচিত জড়িবুটি সম্ভারের মধ্যে বিচিত্র এক বস্তু বন্য অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নীল চ্যাটার্জি ক্ষুরধার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। একটি ছোট্ট অদ্ভুত জিনিস, সেটি প্রাথমিকভাবে কোন অচেনা দুর্লভ প্রজাতির বাঁদরের কঙ্কাল বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কালোমানিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করে নিতান্ত কৌতূহলে সে কঙ্কালটিকে কাছ থেকে দেখে অভিজ্ঞ নীল চ্যাটার্জী সবিস্ময়ে আবিষ্কার করে সে কঙ্কাল একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষের এবং সে মানুষ অবশ্যই পরিণত বয়স্ক। কয়েক ইঞ্চি পুতুলের মতো ওই কঙ্কালটির সূত্র ধরে অতঃপর নীল চ্যাটার্জী কালোমানিকের সঙ্গে তার গ্রামে যাত্রা করে। এই কঙ্কাল কালোমানিক যার কাছ থেকে পেয়েছিল সেই অরণ্যপ্রিয়  সুরোদাদুর সঙ্গে অভিনব উপায়ে সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত কঙ্কালের উৎস স্থল জানা যায়। অতঃপর ওই গভীর অরণ্যেরই এক এযাবৎ অচেনা স্থানে তিনজনের যাত্রা। অরণ্যের অন্তঃপুরে হাজার ফুট গভীর এক খাদ, যেখান দিয়ে নেমে গেছে এক দুরন্ত ঝর্ণা। তারই মধ্যে লতাপাতার গভীরে আচ্ছাদিত এক অতি আধুনিক পথ, সে পথ যে উপকরণে তৈরি তা পৃথিবীর মানুষের এযাবৎ অচেনা। সেই সূত্র ধরেই  এক সুরঙ্গের শেষে এক বড় গুহা এবং সেখানে পেন্সিল সদৃশ এক মন্দিরের মতো নির্মাণ। যার স্বচ্ছ চূড়ায় যেখানে ওই ছোট্ট ছোট্ট সাতটি পুতুল সাজানো ছিল। সপ্তম পুতুলটি সংগ্রহ ঘটনাচক্রে সংগ্ৰহ করেছিলেন সুরোদাদু। জেটি আসনে কাঠের পোশাকে সজ্জিত একটি মনুষ্য আকৃতির কঙ্কাল। কিন্তু সেই মুহূর্তে সেখানে হাজির পাঁচটি পুতুল। ষষ্ঠটি কোথায় গেল? আকস্মিকভাবেই এর উত্তর পেয়ে যায় নীল। অতঃপর পুতুল সদৃশ যারা তারা কি যথার্থই পুতুল? নাকি পুতুল সদৃশ মানুষ ? অথবা তাদের পরিচয় অন্য ? 

উত্তর মিলবে দ্রুত। এই অদ্ভুত পরিস্থিতি ও ঘটনাচক্রে তার সমাধানের মধ্য দিয়ে যে রহস্যের উন্মোচন হয় তার অন্তরালে রয়ে যায় দীর্ঘ পাঁচ হাজার বছর ধরে জমে থাকা ট্রাজেডি। হ্যাঁ, সেই ট্রাজেডি ওই সাতটি পুতুলের।  

নির্বাসিত বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু পরস্পরকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকা এই মহাজাগতিক রহস্যের কেন্দ্রীয় চরিত্রদের জন্য গভীর মানবিক বেদনাময় সহানুভূতিতেই কাহিনী শেষ হয়। 

একটু অন্যধারার গল্প। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের নীল চ্যাটার্জীকে নিয়ে লেখা গল্পগুলির প্রত্যেকটিতে প্রায় মহাজাগতিক রহস্য থাকে এবং সেই রহস্যের প্রকৃতিতে চেনা ধরনের বাইরে একটু অন্যরকম ভাবনা তিনি মিশিয়ে দেন। সেজন্যই গল্পগুলি আরো বেশি আকর্ষণ করে। এখানেও সেই আকর্ষণ নিঃসন্দেহে বজায় রয়েছে।

রিভিউটি লিখেছেনঃ ধ্রুব মন্ডল

Post a Comment

0 Comments