আবার যদি ইচ্ছা কর - নারায়ণ সান্যাল Aabar Jadi Ichha Karo by Narayan Sanyal

আবার যদি ইচ্ছা কর - নারায়ণ সান্যাল Aabar Jadi Ichha Karo by Narayan Sanyal

বই - আবার যদি ইচ্ছা কর
লেখক - নারায়ণ সান্যাল


"Doctor's fees are heavy, lawyer's fees are high,
Artists are just supposed to entertain and die!"

ভিন্সেন্ট ভ্যান গগ হলেন চন্দ্রভান গর্গ, পল গগ্যাঁ'কে গগণ পাল, তেও ভান গগ থেকে সূরযভান গর্গ। আর তাঁদের জীবনীর একপ্রকার ভারতীয়করণ হল এই বই, 'আবার যদি ইচ্ছা কর'। লেখক যখন নারায়ণ সান্যাল, বলার ধৃষ্টতা তো কিছু থাকার কথা নয়, তাও। 'বিশ্বাসঘাতক' পড়েই ওঁর ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম, আর এই বই তো রীতিমতো কাঁদিয়েছে। একদিকে গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে শিল্পী হওয়ার বাসনা, বৈরাগ্য, ব্যভিচার, অন্যদিকে টুকরো টুকরো স্থানীয় ঐতিহাসিক স্মৃতিচারণ (যেমন, রাঁচিতে উন্মাদাশ্রম প্রতিষ্ঠার উষালগ্ন)।
একদিকে কয়লাখনির শ্রমিকদের জীবনসংগ্রাম যা বেলজিয়ামের সাথে বর্ধমানের পার্থক্য রাখে না, অন্যদিকে মানবচরিত্রের অতল অদ্ভুত প্রকৃতি। এ উপাখ্যান শিল্পকে ভালবেসে সাধারণ মানুষ থেকে কালজয়ী শিল্পী হয়ে ওঠার কথা শোনায়। শিল্পী হতে গেলে, তাও আবার নতুন ধারণার শিল্পসৃষ্টি করতে গেলে কত কিছু সহ্য করতে হয়। নতুন ধারণার জন্ম দিতে গিয়ে পাথরের আঘাত সহ্য করা, এখানে যেন খ্রীষ্ট, স্বামী বিবেকানন্দের সাথে একাসনে বসেছেন চন্দ্রভান ওরফে ভিন্সেন্ট ভ্যান গগ।

আর গগণ পাল, "ঝাঁট দে ওসব ছেঁদো কথা" বলা ঐ বেপরোয়া, খামখেয়ালি, উগ্র, আপাত উদাসীন মানুষটার ওপর ঘৃণা দলা পাকিয়ে উঠলেও, শেষে গিয়ে সহানুভূতি আসে যখন সে দেখিয়ে দিয়ে যায়, "A man's work is the explanation of that man!"

শ্রদ্ধা আসে তাহিতি- তনয়া য়ামায়ার প্রতি। বটুকেশ্বর, শান্তিদেবী, যোসেফ মুর্মু, এককড়ি হালদার সহ কোলিয়াড়ির মানুষগুলো, এদের জন্যও মন খারাপ হয়। রাগ হয় পাঁচু হালদার, নাথানিয়েল সাহেবের ওপর। উর্মিলা ডেভিডসন, সুলেখা/ চিত্রলেখা/ ছ্যাতরা, বাতাসী এরা কেউই বোঝে না ভিন্সেন্ট ভ্যান গগকে। হয়তো ভিন্সেন্টও ওদের বোঝেনা। ভিন্সেন্টদের বোধ হয় বোঝা যায় না, তাই দ্বৈপায়ন দাদুর কথা দিয়েই বলতে হয়, "আর চন্দ্রভান! ভিন্সেন্ট ভান গর্গ মরেনি, মরতে পারে না! সে বেঁচে আছে এই আমাদেরই আশেপাশেই,- সে নিশ্চয় ফিরে এসেছে এই পৃথিবীতে। শুধু আমরা তাকে ঠিকমত চিনতে পারছি না। তোমাকে কি বলব নরেন, এই বৃদ্ধ বয়সে গোলদীঘির ধারে, কফি- হাউসের কোণায়, মুক্তি-মেলার আসরে আজও তাকে খুঁজে বেড়াই আমি। নিদারুণ দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত কোনো আর্টিস্টকে যখন কলকাতার ফুটপাতে স্কেচ করতে দেখি আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ি! মনে হয়? - ঐ তো ভিন্সেন্ট! সেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি, সেই ময়লা পায়জামা আর ছেঁড়া পাঞ্জাবি! হাতে ভাঁড়ের চা, মুখে সবুজ-সুতোর বিড়ি! মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নবিত্ত-ঘরের সন্তান,-- কোথায় লেখাপড়া শিখে চাকরি- বাকরি করবি, বিয়ে-থা করবি, রেশন আনবি, সংসার করবি- তা নয়, ওরা ছবি আঁকতে বসেছে। বাড়িতে নিত্য গঞ্জনা, বন্ধুমহলে পাগলা বলে পাত্তা দেয় না, বিয়ের বাজারে ওরা কানাকড়ি! কন্ঠা-বার-করা ঘাড়-কুঁজো থুবড়িগুলো পর্যন্ত ওদের দিকে চোখ তুলে তাকায় না! ওরা যে পাগলামির আগুনে ওদের হাতের সব রেখা- সৌভাগ্য-রেখা, আয়ু-রেখা, যশঃ-রেখা- সব পুড়িয়ে ফেলেছে! ভাল কথা বললে শোনে না, গাল দিলে ভ্রূক্ষেপ করে না- বেহায়াগুলোর দু কান কাটা! আমি ওদের মধ্যে খুঁজে বেড়াই- ওর মধ্যে নতুন-করে-জন্ম-নেওয়া কোনটা আমার সেই হারানো বন্ধু 'কানকাট্টা সেপাই' ভিন্সেন্ট ভান গর্গ?"...

রিভিউটি লিখেছেনঃ Souvik Sadhukhan

Post a Comment

0 Comments